Header Ads

Header ADS

My Bangladesh map

 

তিতুমীরের বিদ্রোহ


তিতুমীর জন্মগ্রহণ করেছিলেন চব্বিশপরগনার অন্তর্গত হায়দারপুর গ্রামে। তিনি প্রথম জীবনে একজন পেশাদার মল্লযোদ্ধা ছিলেন। নদীয়ার একটি দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করার কারণে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি ধর্মচর্চায় মন দেন এবং মক্কায় হজের উদ্দেশে গমন করেন।
সেখানে অবস্থানকালে উত্তর ভারতের বিখ্যাত ওহাবি আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আহমদ বেরেলভির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে তিতুমীর ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে ব্রতী হন। তাঁর ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্র ছিল চব্বিশপরগনা ও নদীয়া জেলার কোনো কোনো অঞ্চল। তিতুমীরের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার স্থানীয় মুসলমান কৃষক তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। তৎকালে বারাসাত অঞ্চলে নীলকুঠির সাহেব ও লবণের ঠিকাদারদের অত্যাচারে স্থানীয় কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তার ওপরেও ছিল জমিদারদের উৎপীড়ন। তিতুমীর অত্যাচার দমনের জন্য দল গড়লেন। চব্বিশপরগনায় হয়ে উঠলেন এক প্রবাদপুরুষ। তাঁর আন্দোলনে ধর্মীয় আবেদন থাকলেও তিতুমীর মূলত কৃষকদের শোষণমুক্তি ও বিদেশি শাসনের বিরূদ্ধে তাঁর আন্দোলন সংগঠিত করেন। তিতুমীরের ওহাবি আন্দোলনে সাম্য ও মৈত্রীর উচ্চ আদর্শ ঘোষিত হওয়ায় নির্যাতিত জনগণ তাঁকে মুক্তির দিশারি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ওহাবি জনতার এই সম্মিলন ও ঐক্যে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল স্থানীয় জমিদাররা। তারা তিতুমীরের এ সংগঠনটিকে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। জমিদার, নীলকর, কুঠির গোমস্তা ও থানার দারোগা মিলে গরিব মুসলমানদের ওপর শুরু করে নানা অত্যাচার। তিতুমীরের দলে অনেকে এসে যোগ দেয়। তাঁর নির্দেশে হিন্দু-মুসলমান প্রজারা জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জনগণ জমিদারের কাছারি আক্রমণ করেছিল ও নিকটবর্তী নীলকুঠিতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। হিন্দু জমিদাররা কৃষক বিদ্রোহকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে প্রচার করতে থাকে। অবশেষে জমিদারের লোকজন একটি মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওহাবিরা এর প্রতিবাদে হিন্দু মন্দিরে ঢুকে গরু কোরবানি করে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে জমিদার ও ওহাবিদের মধ্যে বেঁধে যায় এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা।

যে এলাকায় বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল, ওই এলাকাটি ছিল নীলকুঠির দ্বারা সমাকীর্ণ। তিতুমীরের লোকজন একটা নীলকুঠিতে হামলা চালিয়ে তার তত্ত্বাবধায়ককে বন্দি করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আশপাশের কুঠিয়ালরা তিতুমীরের ভয়ে কলকাতায় পালিয়ে যায়।

তিতুমীরের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল নারকেলবাড়িয়া। সেখানে তিনি বাঁশের একটি কেল্লা নির্মাণ করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ২৯ অক্টোবর পূর্ণার জমিদার কৃষ্ণ রায় সহস্রাধিক লাঠিয়াল, অস্ত্রধারী ও সড়কিওয়ালা সৈন্যবাহিনী নিয়ে নারকেলবাড়িয়া গ্রাম আক্রমণ করেছিল। তাদের আক্রমণে গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা গুরুতর জখম হয়। এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে মুসলমানরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর আবার একটা শক্তি পরীক্ষা হয় কৃষ্ণ রায়ের দলের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তিতুমীরের অনুগামীরা যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। কর্তৃপক্ষ তিতুমীরকে দমনের জন্য কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে ১০০ ঘোড়সওয়ার সৈন্য, ৩০০ পদাতিক দেশীয় সৈন্য ও দুটি কামানসহ তাকে প্রেরণ করে। এর মধ্যে নদীয়ার কালেক্টর সাতক্ষীরা, গোবরডাঙ্গা ও নদীয়ার জমিদারদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।

১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর, ইংরেজ সেনাপতি কর্নেল স্টুয়ার্ট রাতের বেলা নারকেলবাড়িয়া গ্রাম ঘেরাও করেন এবং তিতুমীরের কেল্লার দিকে রণ হুঙ্কার দিতে দিতে এগিয়ে যেতে থাকেন। সেনাপতি গোলাম মাসুম বিদ্রোহী বাহিনীকে ইংরেজ সৈন্যের মোকাবিলা করার আদেশ দেন। শত্রুর ওপর বীরবিক্রমে লাঠি, সড়কি, ঢাল, তরবারি, তীর, ধনুক ও বাঁশের বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিদ্রোহী বাহিনী। কম্পানি সৈন্যরা কামান আর বন্দুকের গুলি ছোড়ে কেল্লার ভেতর। দুটি প্রচণ্ড গোলার আঘাতে তিতুমীরের ডান পাশের উরু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে তিতুমীরের বাহিনী। অনেকেই কম্পানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়। গোলাম মাসুমকে দেওয়া হয়েছিল প্রাণদণ্ড। কয়েকজনকে দেওয়া হয়েছিল দ্বীপান্তর এবং অনেকেরই দেওয়া হয়েছিল কারাদণ্ড। এক অতি অসম লড়াই দিয়ে মৃত্যুর সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে তিতুমীর যে স্বাধীনতার আগুন মানুষের মনে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন, তা-ই এক দাবানল হয়ে উঠেছিল। তাই তো আজও তিতুমীর অনন্য।

No comments

Powered by Blogger.